কলেজের ইতিহাস

সূচনা : ঐতিহাসিক নাটোর শহরে উচ্চ শিক্ষার প্রথম বিদ্যাপিঠ হিসেবে ‘নাটোর কলেজ’ গড়ে ওঠে ১৯৫৬ সালে । ইতিহাস এর পাতা থেকে সঠিক জন্ম তারিখটি পাওয়া যায় ০১জুলাই, ১৯৫৬ খ্রি: হিসেবে। এরপর ১৯৫৯ সালে এর নামকরণ হয় ‘নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা কলেজ’। অতপর ০১মার্চ ১৯৮০ খ্রি: সরকারিকরণের মধ্য দিয়ে জ্ঞানালোকে সমুজ্জ্বল হয়ে অদ্যাবধি অবিরাম জ্ঞান প্রদীপ ছড়িয়ে যাচ্ছে এ কলেজ। ’নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা সরকারি কলেজ’, নাটোর এর মূল ভবনটি ইংরেজি ’E’ টাইপের। এ ছাড়াও এ কলেজের রয়েছে আরো দু’টি দৃষ্টি নন্দন একাডেমিক ভবন।

কলেজের অবস্থান : বর্তমানে কলেজটি শহরের প্রাণকেন্দ্র বড়গাছা মৌজার অর্ন্তগত। নাটোর রেলওয়ে স্টেশন থেকে পূর্বদিকে প্রায় কোয়াটার কিলোমিটার রাজশাহী-নাটোর মহাসড়কের দক্ষিণ পার্শ্বে অবস্থিত। ঐতিহ্যবাহী এই শহরের কোলাহল মুক্ত সবুজ বৃক্ষরাজী শোভিত বড়গাছা এলাকায় প্রায় ৩৪ বিঘা জমির উপর নির্মিত কলেজের পুরো কাঠামোটি প্রাচীন নারোদ নদ দ্বারা দুই ভাগে বিভক্ত। এর বাইরেও নাটোরের লালপুর উপজেলার জোকাদহ মৌজায় কলেজের জন্য ৭৮ বিঘা আবাদি জমি রয়েছে। উক্ত জমি ১৯৫৯ সালে তৎকালীন পাবনা জেলার ঈশ্বরদী থানার অধিবাসী শ্রীযুক্ত মনশ্যাম দাস আগরওয়ালা এবং শ্রীযুক্ত রাধা কিষন আগরওয়ালা কলেজের জন্য দান করেন।

অতীতে ফেরা : মোগল শাসনামলে ১৭০৬ সালে বানগাছির বিখ্যাত জমিদার গণেশরাম রায় ও ভগবতীচরণ চৌধুরী যথানিয়মে রাজস্ব প্রদান করতে না পারায় জমিদারী থেকে উৎখাত হন। ঐ বছর উক্ত পরগণার দেওয়ান রঘুনন্দনের ভাই রামজীবন দিল্লীর স¤্রাট আলমগীরের নিকট থেকে ২২ খানা খেলাত ও রাজা বাহাদুর উপাধী লাভ করেন। এভাবেই গোড়া পত্তন হয় নাটোর নামক করদ রাজ্যের। এরপর কালক্রমে নাটোর জমিদারী বৃদ্ধি পেয়ে রাজশাহী থেকে মালদহ পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করে। নাটোর সামন্ত রাজণ্যদের রাজধানী ছিল বর্তমান নাটোর শহর। ১৭৮৮ সালে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী ক্ষমতায় আসার পর নাটোর জেলা হেড কোয়ার্টার হিসেবে মনোনীত হয়। তখন থেকেই রাজশাহী জেলার হেড কোয়ার্টারে পরিণত হয় নাটোর এবং ১৮২৪ সাল পর্যন্ত প্রশাসনিক কর্মকান্ডের কেন্দ্রবিন্দু ছিল নাটোর। জেলা মর্যাদা পাবার পর নাটোর একটি প্রশাসনিক প্রাণকেন্দ্র ও সম্ভ্রান্ত লোকের আবাসভূমি হিসেবে গড়ে উঠে। কিন্তু প্রশাসনিক কর্মকান্ডের কিছু বাস্তব সমস্যার প্রেক্ষিতে তৎকালীন ইংরেজ প্রশাসনের পরামর্শে জেলা সদর নাটোর থেকে ১৮২৫ সালে রাজশাহীতে (রামপুর বোয়ালিয়ায়) স্থানান্তরিত হয়। এহেন অবস্থায় নাটোরের ঐতিহ্য ও গৌরব রক্ষার প্রেক্ষিতে তৎকালীন সরকার নাটোরকে ১৮২৯ সালে মহকুমা হিসেবে ঘোষণা দেন । নাটোরের প্রথম মহকুমা প্রশাসক ছিলেন ম্যাজিস্ট্রেট বি. এলফিনষ্টোন জ্যাকসন। জেলা প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ ১৯৬ বছর পর এরশাদ শাসনামলে ১৯৮৪ সালে নাটোর পুনরায় জেলার মর্যাদা ফিরে পায়। নাটোরের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, এটি প্রথমদিকে রাজধানীর মর্যাদা পেলেও পরবর্তিতে তা এক পর্যায়ে হ্রাস পেয়েছে।

কলেজের গোড়া পত্তন : ঐতিহ্যবাহী এই কলেজের জন্ম ইতিহাস খুব একটা বর্ণাঢ্যময় নয়। রাজা মহারাজা আর অর্ধ বঙ্গেশ্বরী প্রজাবৎসল ও দেশহিতৈষী মহারাণী ভবানীর স্মৃতি বিজড়িত ঐতিহ্যবাহী নাটোরে তখনও উচ্চ শিক্ষার জন্য কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। রাজা-রাণীগণ স্কুল কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রতি তেমন একটা মনোযোগী ছিলেন না। এ জন্যই মূলত: উচ্চ শিক্ষা গ্রহণে বঞ্চিত হয় এ জনপদের জনসাধারণ। নাটোরের মহারাজা জগদিন্দ্রনাথ রায় ০১জানুয়ারী ১৮৮৪ সালে অবিভক্ত বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মহারাজা হাই স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। পরে জে.এন (জগদিন্দ্রনাথ) হাই স্কুল নামে এটি প্রসিদ্ধি লাভ করে। এই হাই স্কুল ছাড়া এখানে তেমন কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের নয় বছর পর নাটোরে কলেজ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা শুরু হলো। নাটোরের স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের মধ্যে কাজী আব্দুল মজিদ, কাজী আবুল মাসুদ, আব্দুস সাত্তার খান চৌধুরী (মধুমিয়া), ফণী ভূষণ চৌধুরী, খোরশেদ আলম খান চৌধুরী (হুরুম চৌধুরী) ছিলেন কলেজ প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম। তাঁদেরই ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এবং নাটোরের তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক জনাব এম. হোসেন-এর পৃষ্ঠপোষকতা আর উদ্যোগে ১৯৫৬ সালে কলেজ বাস্তবায়নের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়। মহকুমা প্রশাসক জনাব এম. হোসেন এ কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ঠিক সেই সময় বেশ কয়েকটি কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ আবু মোহম্মদ জহুরুল ইসলাম নতুন কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসেন। নাটোরবাসীর শিক্ষার প্রতি এহেন অনুরাগ, উৎসাহ-উদ্দীপনা, ত্যাগ-তিতীক্ষায় মহকুমা প্রশাসক মুগ্ধ হন। অবশেষে এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। নাটোরবাসীর আশার দীপশিখা জ্বললো। কলেজ প্রতিষ্ঠিত হলো। আলো ছড়ানো প্রশান্তিময় দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখা হলো স্মৃতির অম্লান প্রচ্ছদে। তারিখটি হল ০১জুলাই, ১৯৫৬ খ্রি:। “নাটোর কলেজ”-এর আত্মপ্রকাশ ঘটল।

ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও তাৎপর্য : বিশাল ভূমির উপর নৈসর্গিক পরিবেশে ১৯৫৯ সালে কলেজের ভিত্তি স্থাপিত হয়। ঐতিহাসিক ভাবে নাটোর জেলা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। মহাত্মা গান্ধি, কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতি বিজড়িত নাটোর ফকির সন্ন্যাস বিদ্রোহ, ব্রিটিশ ও ইংরেজ বিরোধী আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, ৬৯এর গণঅভ্যুত্থান, সর্বপরি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে নাটোরবাসীর ভূমিকা এদেশের ইতিহাসে অনন্য হয়ে আছে। এমন জাতীয় চেতনা সমৃদ্ধ অঞ্চলে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা কলেজের প্রতিষ্ঠা নিঃসন্দেহে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

কলেজের প্রাথমিক অবস্থা ও কার্যক্রম : সে সময় প্রধান শিক্ষক এম. আনজাম সাহেব স্থানীয় জিন্নাহ মডেল হাই স্কুলভবনকে কলেজ হিসেবে ব্যবহারের জন্য অনুমতি দেন। শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৫৬-১৯৫৭ শিক্ষা বর্ষ থেকে। কলেজে ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি কার্যক্রম শুরু হলো ইন্টারমিডিয়েট অব আর্টস (আই.এ) এবং ইন্টারমিডিয়েট অব কমার্স (আই.কম) বিভাগ নিয়ে। স্কুল সময়ের পূর্বে প্রাতঃকালীন সময়ে কলেজের ক্লাশ করার সিদ্ধান্ত হয়। অল্প কিছুদিন নাটোর জিন্নাহ স্কুলে ক্লাশ চলার পর শহরের শুকুলপট্টিস্থ শুকুলদের পরিত্যাক্ত জীর্ণকায় বাড়িতে অস্থায়ীভাবে কলেজটি স্থানান্তরিত হয়। কলেজভবন তৈরী হয় সেই বাড়ির সামনে ফাঁকা মাঠের পূর্ব পার্শ্বে লম্বা ছাপড়া ঘরের উপরে টিনের ছাউনী আর চারপাশে বাঁশের বাতার বেড়া দিয়ে। বড় ক্লাসগুলো নেয়া হতো নতুন ছাপড়ায় আর ছোট ক্লাসগুলো নেয়া হতো দালানের বিভিন্ন কামরায় এবং মাঝেমাঝে গ্যারেজেও ক্লাস নেয়া হতো। অধ্যক্ষ এবং অন্যান্য শিক্ষকদের জন্য ঐ দালানের বিভিন্ন জায়গায় থাকার ব্যবস্থা ছিল। যদিও কোনটিই আবাস-উপযোগী ছিল না।

নবাব সিরাজ-উদ্-দৌলা কলেজ নামকরণ : সূচনায় ‘নাটোর কলেজ’ হিসেবেই নামকরণ করা হলেও পরবর্তীতে ১৯৫৯ সালে নাটোরের মহকুমা প্রশাসক জনাব আব্দুর রব চৌধুরী কলেজের গভর্নিং বডির এক সভায় নাটোর কলেজের নাম পরিবর্তন করে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার নামে নামকরণ যুক্তিসঙ্গত বলে অভিমত প্রকাশ করেন। নবাবের সাথে নাটোরের মহারাণী ভবানীর সুসম্পর্ক থাকার সুবাদে নবাবের পতনকালে তাঁকে সহযোগীতার উদ্দেশ্যে মহারাণী ভবানী সৈন্য প্রেরণ করেন। এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় কলেজটির নামকরণ নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার নামে করার প্রস্তাব করেন। যা ঐ সভায় সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়।
মহকুমা প্রশাসক জনাব আব্দুর রব চৌধুরী উচ্চাভিলাসী, সংস্কৃতিমনা, কিছুটা উদার প্রকৃতির এবং দক্ষ প্রশাসক ছিলেন। জানা যায় সেই সময় নাটোরে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নবাব সিরাজ-উদ্-দৌলা নাটক মঞ্চায়ন করলে তিনি স্বয়ং নবাব সিরাজের চরিত্রে অভিনয় করেন। নাটকে নবাবের একটি সংলাপ তাঁর মনে দাগ কাটে। সংলাপটি ছিল এরকম- “আমি নাটোরে যাইবো এবং রাণী ভবানীর সহায়তায় পুনরায় সৈন্যবাহিনী গঠন করিয়া বাংলাকে শত্রুমুক্ত করিব” আর এ সংলাপের সূত্র ধরেই মহকুমা প্রশাসক সাহেব নবাবের নামকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য ‘নাটোর কলেজ’ কে ‘নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা কলেজ’ রূপে নামকরণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।
আর এরকম নাটকীয়ভাবে ‘নাটোর কলেজ’ নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা কলেজ-এ নামান্তরিত হয়। এটা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা দেশকে ভালোবেসে ছিলেন। তাই স্বাধীনতার জন্য তাঁর বীরোচিত সংগ্রাম ও আত্মদান নতুন প্রজন্মকে স্বাধীনতার মূল্য অনুধাবনে অনুপ্রেরণা যোগাবে এবং নবাবের পতনকালে মহারানী ভবানীর ঐকান্তিক সহযোগীতার চেষ্টা দেশ প্রেমে উদ্বুদ্ধ নাটোর বাসীর অবদানের গৌরবজ্জ্বল ইতিহাস। কলেজের নামকরণ ঐতিহাসিক এ ঘটনার সাক্ষ্য বহন করে। তাই এই নামকরনের পেছনে আছে ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং নাটোরবাসীর দেশ প্রেমের নমুনা যা কালের সাক্ষি হয়ে আছে, থাকবে। তাই বলা যায় ‘নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা কলেজ’ নামকরণ যথার্থই হয়েছে।

কলেজের নিজস্ব ভবন : ৩১মার্চ ১৯৬০ সালে ’নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা কলেজ’ নামে বর্তমান স্থানে ইংরেজি ‘E’ টাইপের কলেজের একমাত্র ভবনটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন রাজশাহী জেলা প্রশাসক জনাব সামসুর রহমান খান। জানা যায়, কলেজের নক্শা প্রণেতা ছিলেন তৎকালীন পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাব-এ্যাসিসটেন্ট ইঞ্জিনিয়ার জনাব মোঃ আবুল হোসেন (যিনি সিংড়া থানার কৈগ্রামের S.O আবুল হোসেন নামে পরিচিত) এবং এর কন্ট্রাক্টর ছিলেন জনাব আব্দুস সাত্তার খান চৌধুরী (মধুমিয়া)। ১৯৬১ সালের শেষদিকে বর্তমান স্থানে কলেজটি নিজস্ব ভবনে স্থানান্তরিত হয়। নাটোর কলেজ গড়ে তোলার পেছনে তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক জনাব আব্দুর রব চৌধূরী, মহকুমা প্রশাসক জনাব লুৎফর রহমান খান, মহকুমা প্রশাসক জনাব পীয়ার আলি নাজির ও জনাব আব্দুস সাত্তার খান চৌধুরী (মধুমিয়া) সহ কয়েকজন বিশিষ্ট নাগরিক এবং এ কলেজের কয়েকজন অধ্যাপকের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

স্বাধীনতা সংগ্রামে কলেজের অবদান : নাটোর নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা কলেজে ১৯৬৬-১৯৬৭ শিক্ষাবর্ষে প্রথম ছাত্র সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। কলেজের প্রথম সহ-সভাপতি (V.P) নির্বাচিত হন খন্দকার রেজাউন নবী রবি (রবি নামে সমধিক পরিচিত)। ১৯৬৪ সালে তিনি স্নাতক (পাস) কোর্সে ভর্তি হন। রেজাউন নবী ১৯৪২ সালে নাটোর চকবৈদ্যনাথ মহল্লায় সম্ভ্রান্ত খন্দকার পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন বিদ্যানুরাগী এবং সাংগঠনিক ক্ষমতা সম্পন্ন একজন ব্যক্তি। ১৯৬৭ সালে অবৈতনিক ও প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক হিসেবে তিনি নিজস্ব ভূমিতে বনবেলঘরিয়া জুনিয়র হাই স্কুল নামে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। নাটোরের অসহযোগ আন্দোলন এবং প্রতিরোধ যুদ্ধে তিনি প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। তিনি নিজেও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকের ভূমিকা পালন করেছেন। এ কারণেই এলাকার পাকিস্তানপন্থী ও অবাঙালিরা তাঁর ওপর ভীষণভাবে ক্ষুব্ধ ছিল। তাই ’৭১এর ১৫মে তাঁকে বাড়ি থেকে ক’জন অবাঙালি আর ক’জন পাকসেনা একটি জীপে করে তুলে নিয়ে যায় নাটোর ফুল বাগানে। ’৭১এর পাকসেনাদের বন্দিশালা (আর্মি টর্চার ক্যাম্প) তথা কশাইখানা ছিল এটি। তাঁর মা এবং বড় ভাই তাঁকে রক্ষা করতে সেখানে গিয়ে আর ফিরে অসেনি। স্বাধীনতা যুদ্ধে তাঁর এ আত্মত্যাগ এ কলেজের গৌরব গাথাঁর অংশ বিশেষ। বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের পর এলাকাবাসী শহীদ রেজাউন নবীর প্রতি সম্মান দেখিয়ে এবং তাঁর স্মরণে স্কুলটির (বনবেলঘরিয়া জুনিয়র হাই স্কুল) নাম রাখেন- ‘বনবেলঘরিয়া শহীদ রেজাউন নবী উচ্চ বিদ্যালয়’। আজ তাঁদের আত্মীয়-প্রিয়জনদের নিকট ঐ তিনটি শহীদান শুধু শোকাবহ স্মৃতি আর ছবি।

মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে ’নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা কলেজ’ এর অবদান অসামান্য- ইতিহাসে যা অম্লান হয়ে থাকবে। ছাত্র-জনতার সাথে নাটোরের ছাত্র-সংগ্রাম পরিষদ ও সর্বদলীয় স্বাধীনতা সংগ্রাম পরিষদের আন্দোলনে তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক জনাব কামাল উদ্দিন মিয়া (সাবেক EPCS) সহ সকল স্তরের সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারী স্বাধীনতা যুদ্ধের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করেন। নাটোরে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে ‘৭১ এর ১৩মার্চ নাটোরের মহকুমা প্রশাসকের সভাকক্ষে তাঁরই সভাপতিত্বে ছাত্র ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের এবং সরকারী কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে এক সর্বদলীয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় স্থানীয়ভাবে প্রতিরোধ ও পাকবাহিনীকে সাময়িকভাবে মোকাবেলা করার মত একটি শক্তিশালী প্রশিক্ষিত বাহিনী গড়ে তোলার লক্ষ্যে স্বাধীনতাকামী যুব সমাজকে সশস্ত্র উপায়ে প্রশিক্ষণ প্রদান এবং আন্দোলনকে বেগবান করার জন্য একটি কন্ট্রোল রুম প্রতিষ্ঠা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। ঐদিন (‘৭১এর ১৩মার্চ) বিকেল থেকেই নাটোর শূকুলপট্টিস্থ নবাব সিরাজ উদ-দৌলা কলেজ হোস্টেল (বর্তমান রাণী ভবানী সরকারি মহিলা কলেজ) মাঠে ক্যাপ্টেন (অবঃ) হাবিবুর রহমান মহকুমা ফুড কন্ট্রোলারের তত্ত্বাবধানে ব্যাপক ভিত্তিক ‘মুক্তিসেনা’ এর প্রাথমিক প্রশিক্ষণ শুরু হয়। উল্লেখ্য যে, নাটোর শহর অবরুদ্ধ হওয়ার পর পাকবাহিনীর গুলিতে কর্তব্য পালনরত অবস্থায় ক্যাপ্টেন হাবিবুর নিহত হন। ‘নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা কলেজ’ ছিল সে সময়ে নাটোরের মুক্তিযুদ্ধের সূতিকাগার। লাঠি, ফলা আর সড়কি নিয়ে শত শত যুবক মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণে অংশ নেয়। এ ছাড়া নাটোর মহকুমা প্রশাসকের সভা কক্ষের এক সিদ্ধান্ত মোতাবেক ‘জয় বাংলা বাহিনী‘ গঠন করা হয়। আর এ বাহিনীর ট্রেনিং প্রথমে শুরু হয় নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা কলেজের PNCC (পাকিস্থান ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর) এর কাঠের তৈরী ডেমী রাইফেল দিয়ে। সংক্ষিপ্ত সাত দিনের এ ট্রেনিংয়ে প্রথম ব্যাচে অংশ নেন ৬০ জন তরুণ যুবক। তাঁদের মধ্যে বেশীর ভাগই ছিলেন এ কলেজের ছাত্র। সে সময় প্রশিক্ষণরত যোদ্ধাদের খাওয়া ও থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল অত্র কলেজ হোস্টেলে। ট্রেনিং শেষে তাঁদের অনেকের হাতে তুলে দেয়া হয় নাটোর ট্রেজারী থেকে লুট করা সব আগ্নেয়াস্ত্র। এ ছাড়াও পাকবাহিনীর প্রতিরোধ কল্পে নিজস্ব উদ্যোগে ছাত্র নেতৃবৃন্দ বোমা বানানোর জন্য নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা কলেজের রসায়ন বিভাগের ল্যাবরেটরী থেকে রাসায়নিক দ্রব্যাদি নিয়ে আসেন অত্র কলেজ হোস্টেলের প্রশিক্ষণ মাঠে ।

মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে নিহত এ কলেজের ছাত্রদের পরিচিতি: নাটোর নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা কলেজের যে সকল ছাত্র শহীদ হয়েছেন তাঁদের মধ্যে পাঁচজন ছাত্রের নাম সুস্পষ্টভাবে জানা যায়। আমিরুল ইসলাম বাবুল, ১৯৫২ সালে কুষ্টিয়ার তালবাড়ীয়ায় জন্মগ্রহন করেন। একাত্তরে বাবুল নাটোর নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা কলেজের বাণিজ্য বিভাগের ২য় বর্ষের ছাত্র ছিলেন। তিনি মহকুমা ছাত্রলীগের একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন। ’৭১ এর ১২এপ্রিল পাকবাহিনী কর্তৃক নাটোর পতনের পর তিনি বাগাতিপাড়া এলাকায় আত্মগোপন করেছিলেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের সশস্ত্র লড়াইয়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহনের জন্য ভারতে যাবার পূর্বে ২০এপ্রিল বাবুল মায়ের কাছে এসেছিলেন বিদায় নিতে। ঐদিনই অবাঙালীরা খবর পেয়ে কানাইখালী বাসা থেকে বাবুলকে ধরে নিয়ে যায় দিঘাপতিয়ার পাকসেনা ক্যাম্পে। এ খবর শুনে পিতা ট্রাফিক হাবিলদার আব্দুর রশিদ খাঁন অবাঙ্গালিদের পিছু পিছু ছুটে যান বাবুলকে রক্ষা করার জন্য। সেখান থেকে বাবুল ও তাঁর পিতাকে অবাঙালি জল্ল¬াদরা নিয়ে যায় নাটোর ফুলবাগান পাকবাহিনীর অপারেশন ক্যাম্পে। এরপর সেখানে অমানুষিক নির্যাতনের মুখে পিতা-পুত্র উভয়ই ২৫ এপ্রিল মৃত্যু বরণ করেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর বাবুল এর স্মরণে নাটোর টাউন পার্কের নাম রাখা হয় -‘বাবুল পার্ক’।

মাহবুব আলী সেলিম, ১৯৫০ সালে নাটোরের কানাইখালীতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি নাটোর সিরাজ-উদ-দৌলা কলেজের দ্বিতীয় বর্ষ মানবিক বিভাগের ছাত্র ছিলেন। তিনি ছাত্রলীগের একজন সুদক্ষকর্মী ও ক্রীড়াবিদ ছিলেন। ’৭১ এর ২৭এপ্রিল সেলিমকে পাকসেনা মেজর শেরওয়ানী কানাইখালী বাসা থেকে উঠিয়ে নিয়ে যায়। এর ক‘দিন পর মোকরামপুর কালভার্টের কাছে সেলিমের লাশের খোঁজ মিলে নাম নাজানা বেওনেট চার্জ ও গুলি করে হত্যা করা বহু লাশের সাথে । অমানুষিক অত্যাচারে ক্ষতবিক্ষত, বুলেটে ঝাঝরা সেলিমের লাশের মত অনেকের লাশ কবরস্থ করার জন্য তখন অনুমতি মেলেনি। অবশেষে তাঁর আত্মীয় স্বজনরা খবর পেয়ে সন্ধ্যার অন্ধকারে গোপনে সেলিমের লাশ ছাতিয়ানতলা মোকরামপুরে সমাধিস্থ করেন। দেশ স্বাধীনের পর সেলিমের মা-বাবা তাঁর ঐ কবর বাঁধাই করে দেন।
নাটোরের স্বাধীনতা সংগ্রামের কথা বলতে গেলে যাঁদের সংগ্রামী জীবনের কথা স্বাভাবিকভাবে এসে যায় তাঁদের মধ্যে নাটোর নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা কলেজের তিন সাহসী ছাত্রনেতার নাম উল্লেখযোগ্য। তাঁরা হলেন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা মজিবর রহমান রেজা, গোলাম রাব্বানী রঞ্জু এবং আব্দুর রহমান খান চৌধুরী (সেলিম চৌধুরী) ।
শহীদ মজিবর রহমান রেজা, নাটোর শহরের গাড়ীখানা মহল্ল¬ায় ০১বৈশাখ ১৩৫৯ বাংলা সনে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি নাটোর নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা কলেজে পড়াকালীন সময়ে ছাত্র রাজনীতির সাথে জড়িত হন। যুদ্ধের সময় রেজা নাটোর নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা কলেজের বি.এসসি ১ম বর্ষের ছাত্র ছিলেন। তিনি ১৯৬৯ এর গণ-আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী নাটোর মহকুমা ছাত্রলীগের একজন প্রকৃত সংগঠক। অসামান্য কর্ম দক্ষতা এবং সাংগঠনিক কুশলতায় ১৯৭০-১৯৭১ সালে তিনি নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা কলেজের ছাত্র সংসদের ছাত্রলীগ প্যানেলে সাধারণ সম্পাদক পদে বিজয়ী হন।

শহীদ গোলাম রাব্বানী রঞ্জু, ০৭মে ১৯৫০ সালে নাটোর শহরের কানাইখালী মহল্ল¬ায় জন্মগ্রহণ করেন। ছাত্রাবস্থায় তিনি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৬৮ সালে তিনি নাটোর মহকুমা ছাত্রলীগের সহ সম্পাদক নিযুক্ত হন। যুদ্ধকালে রঞ্জু নাটোর নবাব সিরাজ উদ-দৌলা কলেজের বি.কম. ১ম বর্ষের ছাত্র ছিলেন। আত্মপ্রত্যয়ী রঞ্জু ছিলেন নাটোরে কানাইখালীর ‘যুব সংঘ’ এর প্রতিষ্ঠাতা।

’৭১ সালে মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে দেশকে শত্রুমুক্ত করার জন্য দীপ্ত শপথ নিয়ে লক্ষ বাঙ্গালির মতো রেজা ও রঞ্জু ভারত থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে অস্ত্র তুলে নেন। যুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তান দালালদের চক্রান্তে দেশীয় রাজাকারদের হাতে রেজা ও রঞ্জু গুরুদাসপুর থানার মশিন্দা গ্রামে ৩১আগস্ট আটক হন। তারপর চাঁচকৈড় রাজাকার ক্যাম্পে অমানুষিক শারীরিক নির্যাতনের পর ০১সেপ্টেম্বর বীরমুক্তিযোদ্ধা রেজা ও রঞ্জুকে হাত পা বেঁধে বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। ঐ দিনই চাঁচকৈড় থেকে তাঁদের লাশ নাটোর থানায় পৌঁছে দেয়া হয়। ০২সেপ্টেম্বর থানার পুলিশ অফিসার জাফর সাহেবের নির্দেশে লাশ পোষ্ট মর্টেমের পর, থানার মাধ্যমে রঞ্জুর চাচা মোঃ সিদ্দিক হোসেন অনেক চেষ্টার পর তাঁদের লাশ দাফনের জন্য নিয়ে আসেন। আর একারণেই সিদ্দিক হোসেনকে ০১ দিনের কারাদন্ড ভোগ করতে হয়। ’৭১এর ০৪সেপ্টেম্বর শনিবার রঞ্জুদের পারিবারিক কবরস্থান কানাইখালীতে তাঁদের লাশ দাফন সম্পন্ন করা হয়।

শহীদ আব্দুর রহমান খাঁন চৌধুরী (সেলিম চৌধুরী), ১৯৫০ সালে নাটোরের সম্ভ্রান্ত চৌধুরী বাড়ীতে জন্মগ্রহণ করেন। ছাত্র অবস্থাতেই তিনি রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। ১৯৬৯ সালে নাটোর মহকুমা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি মনোনিত হন। ১৯৭১ সালে সেলিম নাটোর নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা কলেজের বি.কম. ১ম বর্ষের ছাত্র ছিলেন। তিনি অসহযোগ আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের এক দৃঢ় প্রত্যয়ী ও দেশপ্রেমিক বীরযোদ্ধা। ’৭১ এর ১২এপ্রিল নাটোর পতনের পর তিনি ০১মে মুক্তিযুদ্ধে প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্যে ভারত গমন করেন। এরপর ০১ডিসেম্বর একটি অপারেশন শেষে ফেরার পথে নওগাঁ মহকুমার ধামইরহাট ও পত্মীতলার মাঝামাঝি স্থানে সেলিমসহ ১৫/১৬ জন মুক্তিযোদ্ধা অকস্মাৎ পাকসেনাদের মুখোমুখি হন। প্রায় আড়াই ঘন্টা যুদ্ধের পর পাকসেনাদের ছোঁড়া বুলেটে সেলিম শহীদ হন।

অন্যসূত্র থেকে জানা যায় যে, এই যুদ্ধ শেষে পাকসেনারা সেলিমের লাশ ট্রাকের পেছনে রশি দিয়ে বেঁধে নওগাঁ শহর প্রদক্ষিণ করেছিল। সেলিমের লাশ কবরস্থ করা হয়েছিল কি না তার সঠিক কোন সন্ধান পাওয়া যায়নি। তবে স্বাধীনতার পর পত্মীতলার স্থানীয় লোকজন ঐ যুদ্ধক্ষেত্রের নিকট একটি বাজারের নাম “সেলিম চৌধুরী বাজার“- নামে নামকরণ করেছিলেন। সেলিমের স্মৃতি রক্ষার্থে তাঁর আত্মীয়-স্বজন নাটোরে তাঁদের নিজস্ব জমিতে ‘শহীদ সেলিম চৌধুরী‘ নামে ১৯৭২ সালে একটি শরীর চর্চা ক্লাব গড়ে তোলেন।

শহীদদের স্মরণে : ১৯৭৩ সালে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা কলেজের সহ-সভাপতি (V.P) বীরমুক্তিযোদ্ধা মোঃ মজিবর রহমান সেন্টু, যিনি শহীদদের সহযোদ্ধাবন্ধু ছিলেন, তাঁদের স্মৃতি রক্ষার্থে কলেজ চত্বরে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করেন। উল্লেখ্য যে, জনাব মোঃ মজিবর রহমান সেন্টু পরবর্তীতে এরশাদ শাসনামলে সাংসদ নির্বাচিত হন। এ স্মৃতিস্তম্ভে রেজা, সেলিম চৌধুরী, রঞ্জু, বাবুল ও আফাজ উদ্দিন এর নাম উৎকলিত করা হয়। উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, বীরমুক্তিযোদ্ধা আফাজ উদ্দিন এ কলেজের দ্বিতীয় বর্ষ মানবিক বিভাগের ছাত্র ছিলেন এবং তিনি ১৯৭৩ সালে নিহত হন। এর দীর্ঘদিন পর ২০০১ সালের ৪ মে নাটোর পৌরসভার চেয়ারম্যান বীরমুক্তিযোদ্ধা এ্যাড. কামরুল ইসলাম রেজা ও রঞ্জুর সমাধির সাথে প্রতিকী কবর হিসেবে শহীদ সেলিম চৌধুরী ও বাবুলের কবর বাধাঁই করেন। উল্লেখ্য যে, এ্যাড. কামরুল ইসলাম ছিলেন উক্ত শহীদদের সহযোদ্ধাবন্ধু। পরবর্তীতে শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর উদ্দেশ্য নাটোর শহরের মাদ্রাসা মোড়ে মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণে একটি স্মৃতিসৌধ তৈরি হয়েছে। যার ফলকে উক্ত শহীদ সহ নাটোর জেলার সকল শহীদদের নাম উল্লেখ আছে।

নাটোরের ঐতিহ্য ও সমৃদ্ধি : আধুনিককালের ধুলি-ধূসরিত এ শহরটির সাথে জড়িয়ে আছে এ জনপদবাসীর গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের প্রায় বিস্মৃত এক অধ্যায়। এ শহরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল এ অঞ্চলের সর্ববৃহৎ সামন্তরাজ্য এবং মহীয়সী নারী রাণী ভবানীর জনকল্যাণমূখী রাজ্যশাসনব্যবস্থা। ১৭০৬ থেকে ১৭১০ সালের মধ্যে শহরের বঙ্গজল এলাকায় চারপার্শ্বে দোহারা জলচৌকির (প্রাকৃতিক নিরাপত্তা বেষ্টনি) দ্বারা বেষ্ঠিত প্রায় ৪২৫ বিঘা জমির ওপর গড়ে উঠে বাংলার বৃহত্তম জমিদারীর রাজধানী। এর পূর্বপার্শ্বে জমিদারী আমলা, বড় ছোট কর্মকর্তা, ঝাড়–দার, কোচওয়ান, হাতিচালক ইত্যাদি ব্যক্তিবর্গের জন্য নির্মিত সুদৃশ্য প্রাসাদভবন রয়েছে যা নাটোর রাজবাড়ি নামে পরিচিত। ১৭১৩ সালে থেকে প্রায় ৪ বছরের মধ্যে নাটোর শহর থেকে তিন কিলোমিটার উত্তরদিকে নাটোর-বগুড়া মহাসড়কের পার্শ্বে দিঘাপতিয়া এলাকায় চারপার্শ্বে সুবিশাল নিরাপত্তা বেষ্ঠিত প্রাচীরের মধ্যে জলচৌকি দ্বারা বেষ্ঠিত প্রায় ১৩৫ বিঘা জমির ওপর নির্মিত দিঘাপতিয়া রাজবাড়ী। যা বর্তমানে উত্তরা গণভবন নামে পরিচিত। এছাড়াও সাম্প্রতিক কালে এ শহরের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে ১৯৮২ সালে নাটোর চিনিকল নামে একটি চিনিকল এবং তারই পাশাপাশি ১৯৮৯ সালে যমুনা ডিস্ট্রিলারী নামে একটি ডিস্ট্রিলারী কারখানা স্থাপিত হয়েছে। কারখানা দু’টির পশ্চিমে একডালা নামক গ্রামে ২০০১ সালে প্রাণ কোম্পানীর একটি কারখানা স্থাপিত হয়েছে। নাটোরের রয়েছে একটি সুপ্রাচীন ও সমৃদ্ধ ইতিহাস। বর্তমানে এটি একটি প্রত্মতাত্ত্বিক ঐশ্বর্যমন্ডিত পর্যটন জেলা শহর।
কিংবদন্তী বনলতা সেন, কাঁচাগোল্লার খ্যাতি
অর্ধবঙ্গেশ্বরী মহারাণী ভবানীর স্মৃতি।
দিঘাপতিয়া উত্তরা গণভবন, রাজ-রাজণ্যের ধাম
কাব্যে ইতিহাসে আছে নাটোরের নাম।
লেখক: মোঃ আতাউর রহমান, বীরমুক্তিযোদ্ধা, উপাধ্যক্ষ, নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা সরকারি কলেজ, নাটোর। প্রবন্ধকার, সমাজসেবক, সৃষ্টিশীল কাজের অন্যতম সংগঠক।
তাঁর লেখা ”মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও শ্রুতি”- পান্ডুলিপি থেকে সংকলিত।

বি: দ্র: নাটোর নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা সরকারি কলেজ এর সংক্ষিপ্ত ইতিহাসে উল্লেখিত তথ্যাদি সংশোধন ও পরিমার্জনযোগ্য।